বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ Breaking News
বালুচদের শ্লোগান ১৯৭১ সালের মুক্তিকামী বাঙালিদের শ্লোগান একই রকম

বালুচদের শ্লোগান ১৯৭১ সালের মুক্তিকামী বাঙালিদের শ্লোগান একই রকম

১৯ আগস্ট ২০২৬ · সর্বশেষ খবর

রঞ্জনা বিশ্বাস।।

`মুজিব কে রাসতে পার চল, বালুচিস্তান কো আজাদ কর’—মাহরাং বালুচ ও স্বাধীনতাকামীদের এই শ্লোগান কি তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের জন্য পরিহাস? ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই মাহরাং বালুচ বেলুচিস্তানের গোয়াদরে অনুষ্ঠিত ‘বালুচ রাজী মুচ্চি’ অনুষ্ঠানে এই শ্লোগান দেন- ‘শেখ মুজিবের পথ ধরো/বেলুচিস্তান স্বাধীন কর’।  ২৪-এর জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশ বিরোধীদের  যে অবস্থান, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের উত্তরাধীকার নিয়ে তাদের যে বিতর্ক সেই বিতর্ক থামবে না। কারণ তাদের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অকেজো হয়ে গেছে, এরা অ্যামিগডালা নামক আদিম মস্তিষ্কের ভয় সংরক্ষণকারী যন্ত্রদ্বারা চালিত হয়। যেখানে যুক্তি নেই, আছে কেবল নির্বোধ আস্ফালন। এই লেখাটি তাদের জন্য নয়।

খুব ভালো ভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, ১৯৭১ সালে দেওয়া মুক্তিকামী বাঙালিদের শ্লোগানের সাথে এই শ্লোগানের কাঠামো একই রকম- নেতৃত্ব + পথ+মুক্তি। বাংলাদেশ (১৯৭১): শেখ মুজিবের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। বেলুচিস্তান (২০২৫):  মুজিব কে রাসতে পর চল, বালুচিস্তান কো আজাদ কর। এই শ্লোগানে তিনটি উপাদান রয়েছে, ১. একজন ঐতিহাসিক নেতা। ২. নেতার অনুসৃত রাজনৈতিক পথ। ৩.সেই পথের গন্তব্যে স্বাধীনতা বা মুক্তি। এই পথ সৃষ্টি হয়েছিল একটি হিমবাহ থেকে যেখানে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় শাসক ও শোষকদের মন ছিল প্রান্তিকদের জন্য অত্যন্ত শীতল। ১৯৭১ সালে সেই শোষকদের বিরুদ্ধে যে মানুষটি হয়ে উঠেছিলেন জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, পাকিস্তানী আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধীর প্রতীক সেই মানুষটিকে আজ দেখা যায় বেলুচদের অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে। তাদের নেতৃত্বের পথ প্রস্তুতকারকের নাম ভূমিকায়।

বেলুচদের কাছে শেখ মুজিব হচ্ছেন সফল জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের  (বাংলাদেশ বিরোধী পাকিস্তানীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন)   আন্তর্জাতিক প্রতীক । ওহ! বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত শিল্পী মোহম্মদ শাহ বাঙালির কথা এ প্রসঙ্গে খুব মনে পড়ে। ১৯৭১ সালেই তিনি গেয়েছিলেন- জোর কইরা শেখ মুজিবকে দিতে চাইছো ব্যথা/ আসলে বানাইয়া দিছো আন্তর্জাতিক নেতা/ কারবার মন্দ না, মন্দ না/ মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম ছাড়ব না। শাহ বাঙালির সেই অনুধাবন তখনও যেমন সত্যে পরিনত হয়েছিল, আজও তা সত্যে পরিণত হলো। ২৪ জুলাই পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবকে মুছে ফেলার রাজাকারী কর্মকাণ্ডর বিপরীতেও তিনি আন্তর্জাতীক প্রতীক!!! কারবার সত্যিই মন্দ না... জয় বাংলা...

এই শ্লোগানে শেখ মুজিব একটি হিস্ট্রিকাল ফ্রেম, যে ফ্রেম ব্যবহার করে বেলুচ নেতা বলতে চাইছেন-‘বাংলাদেশ যেমন পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়েছে, আমরাও তেমনি ভাবে স্বাধীন হতে পারব না কেন? আর এভাবেই বেলুচদের মধ্যে শেখ মুজিবকে নিয়ে তৈরি হয়েছে আন্তঃজাতীয় মুক্তি-আখ্যান মানে ট্রান্সন্যাশনাল লিবারেশন ন্যারেটিভ। এই ন্যারেটিভ শেখ মুজিবকে বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে যেমন জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের আন্তর্জাতিক প্রতীকে রূপান্তরিত করেছে, তেমনি  ব্যক্তি শেখ মুজিবের  রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে আর একবার স্বীকৃতি দিয়েছে।

এই স্বীকৃতি ঠিক তখনই আসে যখন জুলাইবাদীরা তাদের জন্য বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসকে পায়ে দলতে চেয়েছে, যখন স্বাধীনতার ঘোষক আর পাঠকের বিতর্ক  সামনে এনে জাতীয় আন্দলোনের নেতৃত্বকে অস্বীকার করতে চেয়েছে, যখন শেখ মুজিবকে পাকিস্তান ভাঙার অপরাধে তার বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে, তার মনুমেন্ট ভাঙা হয়েছে। জুলাইবাদীরা যখন পাকিস্তানবাদী হতে চাইছে ঠিক তখনই অন্য প্রান্তে শেখ মুজিবের  স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতাকে স্বীকার করে তার পথ অনুসরণের জন্য বালুচরা মরণপণ লড়াই করছে-- কী নির্মম পরিহাস !!!!

শেখ মুজিবকে যতই বিতর্কিত করা হোক তার ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পূর্ণভাবে বিলোপ করা যে সম্ভব না তা এই শ্লোগানেই বোঝা যায় । বেলুচদের এই শ্লোগান একটি ঐতিহাসিক রেফারেন্স... বিশ্বে অনেক আন্দোলনেই অন্য দেশের সফল নেতারা প্রতীক রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন, যেমন— নেলসন ম্যান্ডেলা, হো চি মিন, চে গুয়েভারা, মহাত্মা গান্ধীপ্রমুখ। এবার রেফারেন্স হিসেবে শেখ মুজিব উঠে এলেন, শুধু উঠে আসলেন না বাংলাদেশের তথাকথিতরা যাদেরকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে মুজিবের প্রতীপক্ষ হিসেবে... এই আইরোনি কি হজমযোগ্য??

লেখক- রঞ্জনা বিশ্বাস