বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ Breaking News
বর্জনের সংস্কৃতি ও স্বীকৃতি-বঞ্চনার উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা নয়

বর্জনের সংস্কৃতি ও স্বীকৃতি-বঞ্চনার উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা নয়

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · মতামত

রঞ্জনা বিশ্বাস।। বাংলাদেশে বর্জনের সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে যারা স্বীকৃতি-বঞ্চনার শিকার হন, তারা হতাশা আর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিনযাপন করেন—এমন নয়। তারাও ধীরে ধীরে শত্রু বেছে নেন এবং শত্রুর বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। কিন্তু তারা কি জানেন, তার শত্রু মোটেও সে নয়, যাকে সে বেছে নিয়েছে? বরং তার শত্রু অন্য কেউ—যারা চায়, আপনি এমন শত্রু নির্বাচন করুন, যে বা যারা তাদের আসল লক্ষ্য। আর বঞ্চিত লেখক তাই করছেন? আওয়ামী আমলে পুরস্কার ও স্বীকৃতি না পাওয়ায় আপনি আওয়ামী লীগকে গালি দেবেন, আওয়ামী লীগ-বিদ্বেষী হয়ে উঠবেন। আর অন্যদিকে, যারা আওয়ামী আমলে পুরস্কার ও স্বীকৃতি পাবেন, তারা সুযোগমতো নিজের ইমেজ ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের কাঁধেই দোষ চাপাবেন!!! কী জিনিয়াস আইডিয়া রে বাবা!!! আপনি লেখক, কিন্তু বুঝতে না পারার জন্য আপনি শেষ পর্যন্ত দেশবিরোধীদেরই পারপাস সার্ভ করলেন!!

একজন মেধাবী লেখকের লেখা দিনের পর দিন কোনো পত্রিকায় প্রকাশে অনীহা দেখানো, তার কাজকে নীরবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া, এমনকি তিনি পুরস্কৃত হওয়ার পরও তাকে কোনো সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না জানানো—কিন্তু নিছক অবহেলা নয়। বঞ্চিত লোকটি হয়তো শুরুর দিকে বলবে, ‘আরে, আমি এসবের ধার ধারি না।’ কিন্তু মানুষের শরীরে থাকা ডোপামিন এই বঞ্চনার ক্ষোভকে উসকে দেয়। একদিন, দুই দিন, তিন দিন। এরপর সেই ব্যক্তি একদিন উগরে দেন ক্ষোভ। কার বিরুদ্ধে?

যখন একই বঞ্চনা বারবার ঘটে, যখন যোগ্যতা ও কাজের স্বীকৃতির পরও একজন লেখককে দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে দূরে রাখা হয়, তখন সেটিকে বলা হয় প্রাতিষ্ঠানিক এক্সক্লুশন। আর যদি এর পেছনে থাকে ব্যক্তিগত রাগ, দলগত প্রতিহিংসা, তাহলে বিষয়টি হয়ে ওঠে আরও ভয়ানক।

গত দুই দশকে যেসব লেখক সরকারের আনুগত্য পেয়েছেন, তাদের বড় অংশ বিশেষ মতাদর্শের লোক, যারা সুবিধাবাদী। এদেরকে পত্রিকাওয়ালারা পুরস্কৃত করেছে, লাইমলাইটে এনে। ওরা জানে, ক্ষমতা শুধু কাউকে শাস্তি দেওয়ার মধ্য দিয়ে কাজ করে না। ক্ষমতা ঠিক করে দেয় কে প্রকাশিত হবে, কে আমন্ত্রিত হবে, কার কথা শোনা হবে, কার অর্জন আলোচনায় আসবে এবং কে নীরবে অদৃশ্য হয়ে থাকবে। এই ঠিক করে দেওয়ার রাজনীতিই হচ্ছে মেটিকুলাস। এই মেটিকুলাস ডিজাইন করে শরীরের ভেতরে বাস করা পরজীবীরা। ক্রিমি। এরা প্রকাশ্য হয় সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর।

এই মেটিকুলাস ডিজাইন আওয়ামী লীগ কর্মীরা বোঝে না। তারা ঠিক করতে পারে না কাকে ধরে রাখতে হবে আর কাকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। কারণ তাদের একটি বড় অংশই ক্ষমতার এই রাজনীতি বোঝেন না। আওয়ামী লীগকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করে ব্যক্তিগত নাম ও খ্যাতি অর্জনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইমেজ তৈরির ভেতর দিয়ে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখা। সেই ভূমিকা তারা রাখছে।

ইমেজ তৈরি করে যাদের দৃশ্যমান করা হয়, খেয়াল রাখতে হবে তারা কাদের পারপাস সার্ভ করছে। আর অদৃশ্য করে দেওয়ার ভেতর দিয়ে যাদের আড়াল করা হয়, তারাই বা কী করছে? একই সঙ্গে কারা কাদের ইমেজ তৈরি করছে এবং কারা কাদের ইমেজ তৈরির প্রক্রিয়া থেকে সরে যাচ্ছে, সেটি বুঝতে পারতে শিখতে হবে।

একজন লেখক, একজন কর্মী ও নেতাকে, একজন শিল্পীকে, একজন গায়ককে নিষিদ্ধ না করেও তাকে প্রান্তিক করা যায়। তাকে গালি না দিয়েও তার উপস্থিতিকে অস্বীকার করা যায়। পুরস্কার পেলেও তাকে মঞ্চে না ডেকে বোঝানো যায়, ‘তোমাকে আমরা স্বীকার করছি না।’ এই অস্বীকৃতির পেছনে কিন্তু কোনো একটি বিশেষ পত্রিকার ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা হিংসা কাজ করে না। এখানে একটি বিশেষ দলগত উদ্দেশ্য কাজ করে। গত সতেরো বছরের পুরস্কারের তালিকায় থাকা নামগুলো পাশাপাশি সাজালে চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

তাহলে প্রশ্ন হলো: কে ঠিক করে দেন, সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিসরে কে দৃশ্যমান হবেন আর কে অদৃশ্য থাকবেন? নির্মলেন্দু গুণকে কেনই বা ঘোষণা দিয়ে পুরস্কার নিতে হয়, দৃশ্যমান থাকার পরেও?

এই ক্ষমতার রাজনীতি নিয়েও কথা বলা দরকার। কেউ কি বলবে?

আজ বাধনকে গালি দিয়ে যারা দৃশ্যমান করলেন, তারাও কি বুঝতে পারলেন, তারা বাধনদেরই রাজনীতির শিকার? পারবেন না।

লেখক- রঞ্জনা বিশ্বাস